Friday, November 23, 2018

উহ্য

আমার একটা বন্ধু আছে, উহ্য। জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু গুলোর মধ্যে উহ্য হল একজন। হ্যাঁ, উহ্য আর আমি একই কলেজে পড়ি। সিনেমা বা উপন্যাসের চিরন্তন বন্ধুত্ব গুলোর মত উহ্যর সাথে কলেজের প্রথম দিনে কিন্তু আমার আলাপ হয়নি। বরং কলেজের প্রথম দিনে যে বন্ধুগুলো সাথে আত্মিক যোগাযোগ হয়ে উঠেছিল সেই বন্ধুত্ব গুলিই টেকেনি। প্রেমের ক্ষেত্রে এরকম ব্যাপার হলে তাকে বাংলায় মোহাচ্ছন্নতা বলে আর ইংরেজিতে বলে ইন্ফেচুয়েশন(Infatuation)। যাইহোক সেই না টেকা বন্ধুত্ব গুলো নিয়ে কথা বলতে আমি আসিনি, আজকে আমার কথা উহ্য কে নিয়ে। উহ্যর সাথে প্রথম আলাপ হয় একদিন রাত্রের খাবার খেতে গিয়ে। কলেজের ক্লাস তখন প্রায় এক দেড় মাস হয়ে গেছে, কিন্তু উহ্যর সাথে পরিচয় তখনও হয়ে ওঠেনি। নতুন তখন শান্তিনিকেতনে আসা শান্তিনিকেতনটা তখন সেভাবে সড়গড় হয়ে ওঠেনি। এক নতুন পরিচিত বান্ধবী একদিন বলল "চল, তোদের সস্তায় একটা ভালো জায়গায় খাওয়াতে নিয়ে যাই"। আমিও " আচ্ছা, বেশ" বলে ওর সাথে চলে গেলাম। সেইখানেই উহ্যর সাথে আমার প্রথম আলাপ। এর আগে ক্লাসে ওকে কোনদিন দেখতেই পাইনি। স্বভাবতই আমি খানিকটা আত্মকেন্দ্রিক বলে, চারিপাশটা সেভাবে লক্ষ্য করা হয় না। যাই হোক সেদিন উহ্যর সাথে সাথে আরো অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হলো। এরপর যা হয় আরকি; নতুন কলেজ, নতুন বন্ধুরা। আমাদের এক নতুন বন্ধুমহল করে উঠলো। তারপর সাইকেল নিয়ে একে একে পুরো শান্তিনিকেতন টাকে চোষে ফেলা।  উহ্য তখনও বন্ধুমহলের একজন হয়েই ছিল; উহ্য আর আমার হরিহর আত্মা হয়ে ওঠার গল্প টা অন্য। কলেজের প্রথম বর্ষের পর এল দ্বিতীয় বর্ষ,  পুরোটা সময় আমি কলেজের মোহাচ্ছন্ন বন্ধুত্ব গুলো নিয়ে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। দ্বিতীয় বর্ষের শেষের দিক থেকেই সময় আর পরিবর্তনের রসায়নের জাদু শুরু হতে লাগল। আস্তে আস্তে মোহগুলো কাটতে লাগল। খুব কাছ থেকে মানুষ চিনতে শুরু করেছিলাম তখন। যেগুলোকে সারা জীবনের বন্ধুত্ব মনে হয়েছিল, সেগুলো কেমন ঠুনকো হয়ে গেল; তাসের ঘরের মতো এক এক করে ভেঙ্গে যেতে লাগলো।
               কলেজের প্রথম দুটো বর্ষ আমি মেস বাড়িতেই কাটিয়েছি, তৃতীয় বর্ষে আমি হস্টেল পেলাম। উহ্য বহু আগে থেকেই হোস্টেলে থাকতো। আমি যখন হস্টেল পেলাম উহ্যর আনন্দ দেখে কে! ফেলে আসা মাত্রই উহ্য কাছ থেকে একটা হৃদয়গ্রাহী স্বাগতম পেলাম। এবার হোস্টেলের জীবন যাত্রা, সে এক অনন্য উপন্যাস। উহ্য এবং বাকি বন্ধুরা আমার ঘরে আসতো; আড্ডা, হৈচৈ তে আমার ঘরটা মেতে থাকতো। হোস্টেলে থাকলে যা হয়, বন্ধুরাই কখন নিজের অজান্তে পরিবার হয়ে উঠল তা আমি নিজেই বুঝতে পারিনি। একসাথে খাওয়া দাওয়া, একসাথে চলাফেরা, আড্ডা, মজা, আনন্দ, জীবন যেন ভরে উঠলো‌। হস্টেল জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হল পার্টি। এই পার্টি বলতে আমি কি বলতে চাইছি তা যারা হোস্টেলে দেখেছেন তারাই হয়তো বুঝবেন। এইরকমই উহ্য আমি আর বাকি বন্ধুরা মাঝে মাঝেই পার্টি করে থাকতাম। এইরকমই কোন কোন পার্টিই মাঝে আমরা সবাই কখনো কখনো অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় পৌঁছে যেতাম। একদিন উহ্য একটু বেশি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে উঠেছিল। ওকে সামলানো সবার দায় হয়ে উঠেছিল। সেদিন আমি সহানুভূতি হোক কিংবা সহমর্মিতা উহ্য কে সামলে নিয়ে ছিলাম। আর বাকি বন্ধুরা আমার উদ্দেশে বলেছিল "ভাই, তুই আজ যা করলি, হ্যাটস অফ!!" কিন্তু আমার সাধের উপলব্ধিটা ছিল অন্যরকম। উহ্যর বাক্যালাপ গুলো আর্তনাদের মতো হৃদয় বিদারক ছিল। বুঝতে পেরেছিলাম ভেতর থেকে ও বড়ই একা। এরপর এরকম মুহূর্ত বহু এসেছে গেছে। উহ্য সাথে বন্ধুত্বের টান টা বেড়েছে বই কমেনি। উহ্য কে যত চিনছিলাম যাচ্ছিলাম আমার অহংকারী মনোভাবটারও আস্তে আস্তে পরিবর্তন ঘটছিল। বাকিটা ইতিহাস। একসাথে নদীতে স্নান করতে যাওয়া, আশি কিলোমিটার সাইকেল ট্রিপ, রাত্রে বেলা যখন ইচ্ছে হলো ষ্টেশনে চা খেতে যাওয়া। সব বন্ধুত্ব গুলো অভ্যেস হয়ে উঠছিল। এই অভ্যেস গুলোর মাঝেই উহ্য একদিন সবচেয়ে কাছের বন্ধু গুলোর একজন হয়ে উঠল। সব ভালো জিনিসেরই একটা শেষ থাকে। যথারীতি কলেজের তিনটে বর্ষ দেখতে দেখতে কেটে গেল। আমার জীবনের যেটা লক্ষ্য ছিল সেটা শান্তিনিকেতনে থেকে সম্ভব হতোনা। আমার ভাবনা অনুযায়ী আমার ভবিতব্য অন্য কোনোখানে হওয়ার কথা ছিল। ভাবনা আর বাস্তব কখনো তো এক পথে চলে না। হয়তো এই কারণেই আরো দুই বছরের জন্য আমি শান্তিনিকেতনে আটকা পড়ে রইলাম। এই তিন বছরে শান্তিনিকেতন টা বেশ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। নিজ বাড়ি থেকে শান্তিনিকেতন টা আরো বেশী কাছে হয়ে উঠেছে। দু'বছর অঢেল সময়। নিজের অজ্ঞাতসারেই আমার বেশ শান্তিনিকেতনিকরণ হয়ে গেছে। দু'বছর উপভোগেই নিয়োজিত হয়েছে। আনন্দ-ফূর্তি মজা করে ঘুরে বেড়ানো এসবেই সময় দিনকাল ভালোই কেটে যাচ্ছে।
           উহ্যর জীবনের লক্ষ্য টা বড্ড স্বচ্ছ। আমার এই 'কার্পে ডিয়েম(Carpe diem- seize the day)' মনোভাবের জন্য দিনক্ষণ কেবলই ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। উহ্য এখন ভবিষ্যতের আশঙ্কায় জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য লড়াই করে চলে। সেখানে আমি প্রতিটা দিনই উপভোগ্য করে তুলি।  উহ্য আর আমার যে কখনো মনোমালিন্য হয়নি তা নয়। কিন্তু কেন জানি না মনে হয় এ বন্ধুত্ব চলে যাওয়ার নয়, থাকার। উহ্যর উপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়। প্রতিটা মুহূর্তেই উহ্য দায়িত্ববান হয়ে তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। এরকম বহু বহু বহু ঘটনা আছে, সেগুলো আজ থাক। এখনো কলেজে রোজ আনন্দের মাধ্যমে দিনগুলো কাটছে তাতে সব সময় কি প্রায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উহ্য আমার সাথে থাকে না। জীবনের লক্ষ্য পূরণে ও একটু বেশিই ব্যস্ত এবং বিভ্রান্ত। অনেকে বলেন বেস্ট ফ্রেন্ড নাকি সেই যে প্রত্যেকটা আনন্দের মুহূর্তে দুঃখের মুহূর্তে সব সময় ঘটনাগুলোর সাক্ষী। উহ্য হয়তো সাক্ষী নয়, কিন্তু পাশে আছে আমি জানি। ওর এই ইঁদুর দৌড়ের ব্যস্ত জীবনে এর মাঝে ও রোজ নিয়ম করে রাত ন'টার পর আড্ডা মারতে এবং আমার খোঁজ খবর নিতে আমার হোস্টেলের রুমে আসে। আমার ফূর্তিতে কাটানো দিনগুলোর গল্প শোনে আর বিভ্রান্তিকর জীবনে ও যেন আমার চোখ দিয়ে আনন্দগুলোকে উপভোগ করে নেয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি চালচলন এক কখনোই নয়। যখনই হোস্টেলের রুমে আসে আমি ভাবি কি কথা বলব কিন্তু কথায় কথায় কখন যে সময় পেরিয়ে যায় কারো খেয়াল থাকে না। এর বেশিরভাগ সময়টাই পাঁচ ছয়মাস পর যখন সবাই একে অপরকে ছেড়ে চলে যাব তখন কি হবে সেই ভেবেই এবং তা নিয়ে বিমর্ষ হয়েই কেটে যায়। এভাবে আমাদের বন্ধুত্বটা এক অযৌক্তিক বন্ধুত্বের সংজ্ঞা হিসেবেই থেকে যায়।

উহ্য আর আমি

©Avishek_Tatai_Oistic_Ghosh

উহ্য

আমার একটা বন্ধু আছে, উহ্য। জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু গুলোর মধ্যে উহ্য হল একজন। হ্যাঁ, উহ্য আর আমি একই কলেজে পড়ি। সিনেমা বা উপন্যাসের চি...